কিভাবে মানসিক চাপ ও করোনা ভীতি দূর করবেন

কিভাবে মানসিক চাপ ও করোনা ভীতি দূর করবেন

কভিড ১৯ বা করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে পুরো বিশ্ব আজ আতঙ্কিত,ভীতসন্ত্রস্ত। দিন দিন আক্রান্ত আর মৃতের সংখ্যা বাড়ছে যা মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাছাড়া দীর্ঘদিন গৃহবন্দি থাকার দরুন বিভিন্নরকম মানসিক, শারীরিক, আচরণগত ও মনোসামাজিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে মানুষ। যেমন- আতঙ্ক বা ভয়, দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, বিষন্নতা, অস্থিরতা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, পারিবারিককলহ বৃদ্ধি পাওয়া, রাগ, সূচি বায়, ঘুমেরসমস্যা, নেশা জাতীয় দ্রব্য এবং ইলেকট্রনিক যন্ত্রের প্রতি আসক্তি বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি। অতিরিক্ত চিন্তা ও তীব্র মানসিক চাপের ( Distress) দরুণ উল্লেখিত সমস্যাগুলো প্রখর হচ্ছে যার ফলে মানুষের শারীরিক সুস্থতা ও কর্মক্ষমতা কমে যাচ্ছে। যে কোনো সৃষ্ট চাপমূলক বা ভীতিকর পরিস্থিতিতে মানুষ এক ধরনের শারীরিক প্রতিক্রিয়া ব্যবহার করে যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ” Fight or Flight Response”। অর্থাৎ চাপ মূলক বা ভীতিকর পরিস্থিতির সাথে মোকাবেলা বা খাপ-খাওয়ানোর চেষ্টা করা ( Coping/ Fight) অথবা পরিস্থিতিকে এড়িয়ে যাওয়া ( Flight) । যেহেতু দীর্ঘ চলমান পরিস্থিতি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং অনেকটা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছে তাই এক্ষেত্রে Fight response টা মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক। কীভাবে নিজেকে এই প্রতিক্রিয়ার জন্য তৈরি করবেন আসুন একটু চিন্তা করি-

১। চলমান পরিস্থিতিকে বুঝার চেষ্টা করুন এবং মেনে নিন। এটা আপনার মানসিক চাপ অনেকাংশে কমাতে সাহায্য করবে। মনে রাখবেন পুরো বিশ্বের মানুষ এখন কোনো না কোনো ভাবে আপনার মতো মানসিক চাপেরভেতর দিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং আপনি একা নন।

২। আপনার সারাদিনের কাজের পরিকল্পনা তৈরী করুন পছন্দ অনুসারে এবং সে অনুযায়ী সময়টাকে ভাগ করে নিন। জানি রুটিন মাফিক কাজ করা কঠিন কিন্তু একবার শুরু করুন।পৃথিবীতে শুরু করাটাই কঠিন কাজ। একবার শুরু করতে পারলেই আপনার অভ্যাসই আপনাকে ডিসিপ্লিন্ড করে নিবে।

৩। যে সকল কাজ এতোদিন ব্যস্ততার কারণে করতে পারেন নি বা যা করতে আপনার ভালো লাগে সেগুলো প্রতিদিন টু ডু লিষ্ট এ রাখুন। যেমন- বই পড়া, গান করা, ছবি আকাঁ, মুভি দেখা, রূপচর্চা করা, রান্না করা, আপনজনদের সাথে গল্প করা, খেলাধুলা করা( Indoor) ইত্যাদি। এ সকল কাজ আপনাকে আত্মবিশ্বাসী করবে আর ইতিবাচকচিন্তা করতে সহায়তা করবে।

৪। অনেকেই মানসিক চাপ কমাতে করোনা বিষয়ক সংবাদ না দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু আমার মতে, বার বার সংবাদ না দেখে দিনের একটা নিদিষ্ট সময়ে আপনি আপডেট নিতে পারেন। মনে রাখবেন মডারেট স্ট্রেস ( মৃদু মানসিক চাপ) থাকা ভালো। এটা আপনাকে পরিস্থিতি সম্পর্কে সজাগ রাখবে আর যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় সহায়তা করবে।

৫। বন্ধুবান্ধব, আত্নীয়স্বজন বা পরিচিত মানুষজনের সাথে মোবাইল, টেলিফোন, ই- মেইল বা ম্যাসেজিং এর মাধ্যমে যোগাযোগ রাখুন। এটা আপনার মনমরা ভাব, একাকীত্বতা, বিষন্নতা ও উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করবে।

৬। অতিরিক্ত চিন্তা( Over thinking) মানুষকে অস্থির ও বিপর্যস্ত করে তোলে। সব কিছু আপনার হাতে নেই। যা হবার তাই হবে। সুতরাং অতীত বা ভবিষ্যতে না গিয়ে সচেতনভাবে বর্তমানে থাকার চেষ্টাকরুন। আর অতিরিক্ত চিন্তাকে বলুনঃ You are just thoughts and mind it I can choose what I do with you.And I can make the decision to let you go.

৭। মন বা শরীরের যত্নে ব্যায়ামের কোনো বিকল্প নেই। কোয়ারান্টাইন এ ঘরে বসেই আপনি রিল্যাক্সেশান বা শিথিলিকরণ, মাইন্ডফুলনেস,মেডিটেশন, গভীর শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়ার পদ্ধতিগুলো অনুসরণকরতে পারেন যা আপনি গুগল বা ইউ টিউবে খুব সহজেই পেতে পারেন।এ সকল ব্যায়াম আপনার শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করবে আর মানসিকচাপ কমাতে সাহায্য করবে।

৮। গৃহবন্দী থাকার কারণে বা অলস সময় পার করতে অনেকেই সোস্যাল মিডিয়ায় বেশী সময় ব্যয় করছে যা পরবর্তীতে মারাত্মক আসক্তিতে রুপান্তরিত হয়ে মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের পক্ষে হুমকির কারন হতে পারে। তাই সময়কে ভাগ করে নিন, ভারচুয়াল জীবনের তুলনায় বাস্তব জীবনে বেশী সময় দিন। Never forget who was with you from the start – হ্যাঁ, আমি পরিবারের কথাই বলছি। পরিবারকে সময় দিন। মনে রাখবেন, পৃথিবীতে Unconditional love আপনি ঐ একটা জায়গায় পাবেন আর এতে করে আপনার মানসিক প্রশান্তি আসবে।

৯। সমস্যা মানুষের জীবনেরই একটা অংশ। Psychology says” Try to find the possibilities not only the problems itself”। এই করোনা পরিস্থিতি আপনাকে সুযোগ করে দিয়েছে ভাবার – মানুষ মানুষের জন্য। তাই নিজেকে আরো একটিবার ঢেলে সাজান, সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের পাশে দাড়াঁন, সাহায্যে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন। মানবতাই চিত্তের খোরাক হয়ে আপনাকে মানসিক চাপমুক্ত রাখবে।
১০। দিনশেষে আপনি আপনার জন্য। Self help is the best help. সুতরাং নেতিবাচক দুশ্চিন্তা বাদ দিয়ে I- me – myself থিওরিতে চলে আসুন। প্রথমে নিজেকে ভালো রাখুন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন, ঘরে থাকুন। আপনার সচেতনতাই পারে আপনার পরিবার, সমাজ ও দেশকে ভালো রাখতে।

পরিশেষে বলবো, যেটা অনিবার্য সেটা নিয়ে ভয়, দুশ্চিন্তা করে কী লাভ?? পবিত্র কুরআনে তো মহান রব বলেই দিয়েছেনঃ প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করতে হবে( সূরা আল ইমরান, আয়াত ১৮৫)। সুতরাং বেশি বেশি করে স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণ করুন এবং আসুন মরার পূর্বে না মরে ভবিষ্যত বিনির্মানের প্রত্যয়ে আরো একটি বার গঠনমূলক চিন্তাধারায় বিকশিত হই। পৃথিবী সেরে উঠুক, সুদিন আবার ফিরে আসুক।

ধন্যবাদান্তে,
লুৎফুন নাহার
প্রভাষক
মনোবিজ্ঞান বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যাল, চট্টগ্রাম।

aurora travel agentSecret Recipebest pot racksFreelancer KonokBest Freelancer in Bangladesh